পূর্ব বর্ধমানের গলসীর চান্না আশ্রম ছিল ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের এক গোপন ঘাঁটি। স্বামী নিরালম্ব ও বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত এই আশ্রমে আসতেন ভগৎ সিং, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসুদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা—এমনই দাবি লোকমুখে প্রচলিত। চার থানার মাঝখানে অবস্থিত এই আশ্রম ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের উপর নজরদারির আদর্শ কেন্দ্র। ইতিহাস, বিপ্লবী কার্যকলাপ ও আজকের অবহেলিত অবস্থাকে ঘিরে পড়ুন পশ্চিম বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিরল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস।
বর্ধমানের ইতিহাস মানেই সাধারণত কৃষক আন্দোলন, তেভাগা, স্বদেশি আন্দোলন কিংবা শ্রমিক রাজনীতির দীর্ঘ কাহিনি। কিন্তু এই জেলার বুকেই লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়, যার কথা মূলধারার ইতিহাসে খুব কমই উচ্চারিত হয়। পূর্ব বর্ধমানের গলসীর চান্না গ্রাম—আজ শান্ত, নিরিবিলি, প্রায় বিস্মৃত এক জনপদ। অথচ একসময় এই গ্রামেরই খড়ি নদীর ধারে গড়ে উঠেছিল এমন এক আশ্রম, যা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের গোপন সদর দফতর। চান্না আশ্রম—যা ইতিহাসের কাছে “নিরালম্ব স্বামীর আশ্রম” নামেও পরিচিত—ছিল কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার জায়গা নয়। সেটি ছিল বিপ্লবীদের গোপন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মতাদর্শের পাঠশালা এবং স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখার এক নীরব কর্মশালা। আজ সেই আশ্রমের ভগ্নপ্রায় মাটির ঘরে গরু চরছে। ইতিহাসের শরীরে জমছে আগাছা।
খড়ি নদীর ধারে বিপ্লবের জন্ম
১৯০৭-০৮ সাল নাগাদ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি পরে “শ্রীমৎ স্বামী নিরালম্ব” নামে পরিচিত হন, গলসীর চান্না গ্রামে এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের যে মানসিক প্রস্তুতি বাংলায় তৈরি হচ্ছিল, চান্না আশ্রম ছিল তারই এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ যতীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াই নয়—এটি আত্মিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলনও। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছিল এই আশ্রম। চন্দন গাছের জঙ্গল ঘেরা নির্জন এলাকা, পাশে খড়ি নদী, চারদিকে গ্রামীণ নিস্তব্ধতা—গোপন বৈঠক ও বিপ্লবী সংগঠনের জন্য এর চেয়ে আদর্শ জায়গা আর কীই বা হতে পারত! একদিকে গলসি থানা, অন্যদিকে আউসগ্রাম, ভাতার ও বর্ধমান থানার সীমানা—ভৌগোলিক অবস্থানও ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে যোগাযোগ রক্ষা এবং আত্মগোপনের জন্য এই অঞ্চল ছিল উপযুক্ত।
আশ্রমের আড়ালে বিপ্লবীদেরআখড়া –
বাইরে থেকে এটি ছিল সাধারণ আশ্রম। সেখানে চরকা কাটা হত, শরীরচর্চা হত, ধর্মীয় আলোচনা হত। কিন্তু রাত নামলেই বদলে যেত পরিবেশ। শুরু হত গোপন সভা, রাজনৈতিক আলোচনা, বিপ্লবের রূপরেখা তৈরি। স্থানীয়দের মতে, এখানে তরুণ বিপ্লবীদের লাঠিখেলা, ছুরি চালনা, গোপন বার্তা আদানপ্রদান এবং আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। অনেকে সন্ন্যাসী বা শিক্ষকের ছদ্মবেশে আশ্রমে থাকতেন। চান্না আশ্রম কার্যত হয়ে উঠেছিল বাংলার বিপ্লবী সংগঠনগুলির এক গোপন ‘সেফ হাউস’।
চার থানার মাঝখানে বিপ্লবের গোপন সদর দফতর
লোকমুখে আজও একটি কথা ঘুরে বেড়ায়—চান্না আশ্রম শুধুমাত্র নির্জনতার জন্য বিপ্লবীদের ঘাঁটি হয়ে ওঠেনি, এর পিছনে ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও কৌশলগত চিন্তাভাবনা। স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন অবিভক্ত বর্ধমান জেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ থানা এই চান্না গ্রামের চারদিক ঘিরে ছিল। পশ্চিমে আউসগ্রাম থানা, উত্তরে ভাতার থানা, পূর্বে সদর থানা এবং দক্ষিণে গলসি থানা।সেই সময় প্রশাসনিক স্তরের অধিকাংশ সরকারি কর্মকাণ্ড, পুলিশি তৎপরতা এবং ব্রিটিশ সরকারের নানা নির্দেশ কার্যকর হত এই থানা কেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই। ফলে চার থানার মধ্যবর্তী এই ভৌগোলিক অবস্থান চান্না আশ্রমকে করে তুলেছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নজরদারি কেন্দ্র।স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় উল্লেখ রয়েছে, বিপ্লবীরা খুব সহজেই বিভিন্ন থানার গতিবিধি, পুলিশি অভিযান কিংবা প্রশাসনিক তৎপরতার খবর সংগ্রহ করতে পারতেন এই অঞ্চল থেকে।
এক থানায় চাপ বাড়লে অন্য দিক দিয়ে সরে যাওয়ার সুযোগও ছিল। ফলে ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে গোপন বৈঠক, বার্তা আদানপ্রদান এবং আত্মগোপনের জন্য চান্না আশ্রম ছিল প্রায় আদর্শ জায়গা।চন্দন জঙ্গলে ঘেরা নির্জন পরিবেশ, পাশে খড়ি নদী এবং চার থানার সংযোগস্থলে অবস্থান—এই সমস্ত কিছু মিলিয়েই চান্না আশ্রম ধীরে ধীরে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।সম্ভবত এই কারণেই ব্রিটিশ গোয়েন্দারা আশ্রমটিকে ঘিরে সবসময় সন্দিহান ছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, এটি শুধুমাত্র সাধনা বা সমাজসেবার আশ্রম নয়—এটি ছিল প্রশাসনিক নজরদারি ও বিপ্লবী সংগঠনের এক নীরব কৌশলগত ঘাঁটি।
ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে বাংলার গোপন সেতুবন্ধন
চান্না আশ্রমকে ঘিরে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হল এর সঙ্গে সর্বভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের সম্ভাব্য যোগাযোগ। বিশেষত Bhagat Singh–এর নাম যখন এই ইতিহাসে উঠে আসে, তখন গলসীর এই ছোট্ট গ্রাম যেন জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।ঐতিহাসিকভাবে ভগৎ সিং সরাসরি চান্না আশ্রমে এসেছিলেন—এমন নির্ভুল সরকারি নথি সীমিত। তবে বাংলার যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি এবং উত্তর ভারতের হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত।লোকমুখে প্রচলিত আছে, ভগৎ সিং, তাঁর বাবা কিষেণ সিং, Batukeshwar Dutt, Lala Lajpat Rai, Subhas Chandra Bose, Rash Behari Bose, Aurobindo Ghosh, Barindra Kumar Ghosh, Chittaranjan Das-সহ বহু বিপ্লবীর পদধূলি পড়েছিল এই আশ্রমে।
এই দাবি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও এটুকু স্পষ্ট—চান্না আশ্রম ছিল সেইসব গোপন কেন্দ্রগুলির একটি, যেখানে বাংলার বিপ্লবী চেতনা সর্বভারতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।বিশেষত Jatindranath Das বা যতীন দাসের আত্মবলিদানের পরে বাংলার বিপ্লবী সংগঠন ও উত্তর ভারতের বিপ্লবীদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। সেই প্রেক্ষাপটে চান্না আশ্রমের মতো কেন্দ্রগুলির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ পুলিশের নজরে –
ব্রিটিশ গোয়েন্দারা দ্রুত বুঝতে পেরেছিল, এই ধরনের আশ্রমগুলি শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলি ছিল বিপ্লবী মানসিকতা তৈরির কারখানা।তাই চান্না আশ্রমেও একাধিকবার তল্লাশি চালানো হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। যদিও বড় অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার হয়নি, কিন্তু আশ্রমের উপর নজরদারি কখনও কমেনি। কারণ ব্রিটিশ প্রশাসন জানত, বন্দুকের থেকেও বিপজ্জনক হল সংগঠিত চেতনা।
অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস
আজ সেই আশ্রম কার্যত ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে। দু’চালার মাটির ঘরটি কোনওক্রমে টিকে আছে। চারপাশে আগাছা, অব্যবস্থা, অনাদর।আশ্রমের পরিচালন কমিটির সদস্যদের দাবি, সরকার এই ঐতিহাসিক স্থানটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করুক। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে একসময় ইকো-ট্যুরিজম পার্ক তৈরির পরিকল্পনার কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু জমি সংক্রান্ত জটিলতায় সেই প্রকল্প আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অমূল্য ইতিহাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে।
ইতিহাসের কাছে আমাদের ঋণ
স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু দিল্লি, কলকাতা বা লাহোরের গল্প নয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত তৈরি হয়েছিল এমন অসংখ্য গ্রামীণ আখড়া, আশ্রম ও গোপন কেন্দ্রকে ঘিরে।গলসীর চান্না আশ্রম সেই ইতিহাসেরই এক বিস্মৃত অধ্যায়।যেখানে স্বাধীনতা ছিল শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়—ছিল আত্মত্যাগের সাধনা। যেখানে বিপ্লবীরা রাতের অন্ধকারে ভবিষ্যতের ভারত কল্পনা করতেন। যেখানে বাংলার মাটি হাত মিলিয়েছিল পাঞ্জাবের আগুনের সঙ্গে।আজ যখন স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে পড়ার সময় এসেছে, তখন চান্না আশ্রম শুধু একটি পুরনো স্থাপনা নয়—এটি ভারতের বিপ্লবী চেতনার এক জীবন্ত দলিল।আর সেই দলিলকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু সরকারের নয়, আমাদের সকলের দায়িত্ব।