হোম বাংলার ফিড পাবলিক স্ফিয়ার অফ দ্য লেন্স গ্রাউন্ড নোট রুরাল নোটবুক ক্যাম্পাস ভাইবস্ লিগ্যাল বিট অন্যান্য

ফ্যান্টাসির মোড়কে কমিউনিস্ট-বিরোধী প্রচার: পপ কালচার, ঠান্ডা লড়াই এবং ক্যাপিটালিস্ট কল্পনার রাজনৈতিক ইতিহাস

Published on: June 17, 2026
---Advertisement---

স্ক্রিনে যা দেখি, তা কি শুধুই বিনোদন?

১৯৮৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল Rambo: First Blood Part II। সেই সময় আমেরিকা জুড়ে ঠান্ডা লড়াই আবার তীব্র। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান প্রকাশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলেছিলেন “Evil Empire”। একই সময় হলিউডে তৈরি হচ্ছিল এমন সব সিনেমা, যেখানে একা আমেরিকান নায়ক ‘স্বাধীনতা’র রক্ষক, আর শত্রুপক্ষ প্রায় সর্বদাই কোনও না কোনও সমাজতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শক্তি।

আবার তারও বহু আগে, ১৯২৯ সালে ইউরোপীয় কমিক চরিত্র টিনটিনকে পাঠানো হয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়। Tintin in the Land of the Soviets–এ দেখানো হয়েছিল এক ধূসর, ক্ষুধার্ত, প্রতারণায় ভরা সমাজ— যেখানে নির্বাচন ভুয়ো, জনগণ আতঙ্কিত, আর রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান।

এই দুই উদাহরণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় অর্ধশতাব্দী। কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামো একই।সমষ্টিবাদী সমাজকে বিপজ্জনক হিসেবে দেখানো, ব্যক্তিনির্ভর নায়কতন্ত্রকে মহিমান্বিত করা, এবং ক্যাপিটালিস্ট “স্বাধীনতা”-কে মানবসভ্যতার একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রশ্ন হল—
এগুলি কি নিছক কাকতালীয়? নাকি জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভিতর দিয়েই বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়েছে?

READ MORE – চে ও চুরুট

সংস্কৃতি: ঠান্ডা লড়াইয়ের নরম অস্ত্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী ভাগ হয়ে যায় দুই শক্তিকেন্দ্রে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। ইতিহাসবিদ জন লুইস গ্যাডিস ঠান্ডা লড়াইকে “war of narratives” বলেছিলেন। অর্থাৎ এটি শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল ধারণার যুদ্ধ। মার্কিন প্রশাসন খুব দ্রুত বুঝেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুধু অস্ত্র যথেষ্ট নয়। মানুষের কল্পনাশক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত Congress for Cultural Freedom— যার সঙ্গে পরে CIA-র সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে— ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে কমিউনিস্ট-বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ তৈরি করেছিল। একই সময় হলিউড, কমিক ইন্ডাস্ট্রি, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবং বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলি তৈরি করতে থাকে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক ভাষা।
সেখানে—

●     সমাজতন্ত্র মানেই দমন,

●     কমিউনিস্ট রাষ্ট্র মানেই নজরদারি,

●     সমষ্টি মানেই স্বাধীনতার মৃত্যু,

●     আর ক্যাপিটালিজম মানেই ব্যক্তিস্বাধীনতা, প্রযুক্তি ও আধুনিকতা।

এই ন্যারেটিভ এত ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত হয়েছিল যে তা পরে “স্বাভাবিক সত্য” বলে মনে হতে শুরু করে।

টিনটিন: ইউরোপীয় শিশু সাহিত্যে সোভিয়েত ভীতি

হার্জের টিনটিন সিরিজকে আজও ইউরোপীয় কমিকসের ক্লাসিক বলা হয়। কিন্তু প্রথম দিকের কাজগুলির মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ছিল। বিশেষ করে Tintin in the Land of the Soviets–এ সোভিয়েত রাষ্ট্রকে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ ও প্রতারণামূলক হিসেবে দেখানো হয়।

গবেষকদের মতে, এই বইটি তৈরি করার সময় হার্জে মূলত বেলজিয়ামের ডানপন্থী সংবাদপত্র Le Vingtième Siècle-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সেই সংবাদপত্রের সম্পাদক অ্যাবে নরবের ভালেজ ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট-বিরোধী। ফলে টিনটিনের সোভিয়েত অভিযান আদতে সাংবাদিকতা ছিল না; ছিল মতাদর্শিক নির্মাণ। মজার বিষয় হল, পরে হার্জে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছাড়াই বইটি লিখেছিলেন। অর্থাৎ বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক আবহই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ম্যাকার্থিজম ও হলিউডের রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান

১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে আমেরিকায় শুরু হয় ম্যাকার্থিজম। সেনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির নেতৃত্বে হাজার হাজার শিল্পী, লেখক, অভিনেতা ও পরিচালককে “কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীল” বলে অভিযুক্ত করা হয়।হলিউডে তৈরি হয় “Hollywood Blacklist”। বহু শিল্পীর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। চার্লি চ্যাপলিনের মতো শিল্পীকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়।এই সময় থেকেই হলিউড আরও বেশি করে “উগ্র জাতীয়তাবাদ ” ও “অ্যান্টি-কমিউনিস্ট” গল্প তৈরি করতে শুরু করে। সিনেমা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র।

জেমস বন্ড থেকে র‍্যাম্বো: শত্রুর নতুন মুখ

ষাটের দশকে জেমস বন্ড সিরিজ পশ্চিমা গোয়েন্দা-নায়কের গ্ল্যামারাইজড সংস্করণ তৈরি করে। যদিও সব ছবিতে সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম ছিল না, কিন্তু “পূর্ব ইউরোপীয়”, “রেড নেটওয়ার্ক” বা “রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গোপন সংগঠন”— এই ধরনের প্রতীক বারবার ফিরে এসেছে।

তার পরে আসে র‍্যাম্বো।

বিশেষ করে Rambo III (১৯৮৮)-তে সোভিয়েত ও ভিয়েতনামী সেনাবাহিনীকে দেখানো হয় নির্মম দখলদার হিসেবে। আফগান মুজাহিদিনদের স্বাধীনতার যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ঠান্ডা লড়াইয়ের বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে এই সিনেমার সম্পর্ক ছিল গভীর।কারণ সেই সময় আমেরিকা সত্যিই আফগান মুজাহিদিনদের সমর্থন করছিল সোভিয়েত বিরোধিতার কারণে।অর্থাৎ সিনেমা এবং ভূ-রাজনীতি একে অপরের প্রতিফলন হয়ে উঠেছিল।

সুপারহিরোদের উত্থান এবং নিওলিবারেল যুগ

১৯৯০-এর পরে বিশ্ব রাজনীতিতে নিওলিবারেল অর্থনীতি শক্তিশালী হতে শুরু করে। রোনাল্ড রেগান ও মার্গারেট থ্যাচারের সময় “free market” হয়ে ওঠে নতুন বিশ্বমন্ত্র।ঠিক এই সময়েই জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে সুপারহিরোদের নতুন উত্থান ঘটে।গবেষক ফ্রেডরিক জেমসন লিখেছিলেন, দেরি-পুঁজিবাদের সংস্কৃতিতে নায়ক হয়ে ওঠে “corporate individualism”-এর প্রতীক।

ব্যাটম্যান, আয়রন ম্যান, এমনকি অনেক আধুনিক সুপারহিরোই ধনী, প্রযুক্তিনির্ভর, এবং রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি। তারা গণআন্দোলন বা সংগঠিত রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না; বরং “বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি” হিসেবেই পৃথিবীকে বাঁচায়। এটি নিছক গল্প নয়। এটি নিওলিবারেল রাজনৈতিক দর্শনের সাংস্কৃতিক রূপ।

অ্যানিমেশন, ভিডিও গেম এবং ‘ইভিল কালেক্টিভ’-এর ধারণা

আজকের ডিজিটাল প্রজন্মের রাজনৈতিক অবচেতন অনেকটাই তৈরি হচ্ছে গেমিং ও অ্যানিমেশন সংস্কৃতি থেকে।

অনেক জনপ্রিয় গেম বা সিরিজে দেখা যায়—

●     “হাইভ মাইন্ড” সমাজ,

●     ইউনিফর্ম পরা সৈন্যদল,

●     সর্বক্ষণ নজরদারি,

●     ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব,

●     এবং সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহী নায়ক।

এই ভিজ্যুয়াল ভাষা সরাসরি ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রচার কৌশল থেকে এসেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও সেই সাংস্কৃতিক কাঠামো টিকে গেছে। এখন “কমিউনিজম” শব্দটি না বলেও একই রাজনৈতিক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

কেন যুবসমাজ এই ন্যারেটিভের কেন্দ্র?

কারণ আধুনিক পুঁজিবাদ জানে— ভবিষ্যতের বাজার তৈরি হয় তরুণদের মানসিকতার উপর।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, কমিক ফ্র্যাঞ্চাইজি, গেমিং ইন্ডাস্ট্রি— সব মিলিয়ে এখন কয়েকশো বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসা। আর এই শিল্প শুধু বিনোদন বিক্রি করে না; জীবনদর্শনও বিক্রি করে।

“নিজেকে ব্র্যান্ড বানাও”
“নিজের জন্য লড়ো”
“ব্যক্তিগত সাফল্যই শেষ সত্য”

এই দর্শন নিওলিবারেল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে সমষ্টিগত রাজনীতি, ইউনিয়ন, গণআন্দোলন বা শ্রেণি-চেতনা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় সংস্কৃতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়