তামিলনাড়ুর মাদুরাই জেলার Vannivelampatti গ্রাম কেন পরিচিত ‘কমিউনিস্ট গ্রাম’ নামে? কেন আজও সেখানে শিশুদের নাম রাখা হয় মার্কস, লেনিন, স্টালিন ও চে গেভারার নামে? পড়ুন ভারতের এক বিরল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস।
বার্লিন প্রাচীর ভেঙেছে, সোভিয়েত ভেঙেছে— কিন্তু মাদুরাইয়ের এই গ্রামে এখনও বেঁচে আছে সাম্যবাদের দৈনন্দিন জীবন
মাদুরাই শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রাস্তা যত এগোয়, তামিলনাড়ুর মাটির রং যেন তত বদলে যেতে থাকে। দু’পাশে তালগাছ, মাঝেমধ্যে পাথুরে জমি, কোথাও চিনাবাদামের খেত, কোথাও ভুট্টা। দক্ষিণ ভারতের সেই পরিচিত গ্রামীণ ভূগোলের মধ্যেই আচমকা যেন অন্য এক রাজনৈতিক পৃথিবীর মুখোমুখি হতে হয়।গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করে ডাকছে— “লেনিন!” একটু দূরে আর এক জনের নাম “মার্ক্স”। চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের নাম “স্টালিন”।
অটোচালকের নাম “দিমিত্রি”। জিম প্রশিক্ষকের নাম “সফদর হাশমি”।
প্রথমে মনে হতে পারে, এ যেন কোনও রাজনৈতিক নাটকের সেট। কিন্তু না, এ বাস্তব। তামিলনাড়ুর মাদুরাই জেলার ছোট্ট গ্রাম Vannivelampatti-র বাস্তব। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যার পরিচয়— “কমিউনিস্ট গ্রাম”। এখানে সাম্যবাদ কোনও বইয়ের তত্ত্ব নয়, দেয়ালে আঁকা স্লোগানও নয়। তা মানুষের নামের মধ্যে আছে, আড্ডার মধ্যে আছে, সন্তান পালনের স্বপ্নে আছে, এমনকি গ্রামের আত্মপরিচয়ের মধ্যেও মিশে আছে।
যেখানে নামই রাজনৈতিক ইতিহাস
ভারতের অধিকাংশ গ্রামে মানুষের নাম ধর্ম, পুরাণ, দেবদেবী বা পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সেখানে Vannivelampatti-তে বহু মানুষের নাম মার্ক্স, লেনিন, এঙ্গেলস, স্টালিন, ফিদেল কাস্ত্রো, হো চি মিন কিংবা চে গেভারা।এমনকি যাদের সরকারি নাম অন্য কিছু, তাদের ডাকনামেও কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকে বিপ্লবের অভিধান।গ্রামের প্রবীণ সিপিআই(এম) কর্মী ভি মুরুগানকে সকলে “স্টালিন” বলেই চেনেন। তাঁর কথায়,“আমাদের কাছে মার্ক্স বা লেনিন শুধু আন্তর্জাতিক নেতা ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।”এই নামকরণের মধ্যেই আসলে লুকিয়ে আছে গ্রামের সামাজিক ইতিহাস।কারণ, এখানে সন্তানদের নাম কমিউনিস্ট নেতাদের নামে রাখা নিছক রাজনৈতিক আবেগ নয়; এটি এক ধরনের উত্তরাধিকার হস্তান্তর। এক প্রজন্ম পরের প্রজন্মকে বলতে চেয়েছে— “আমরা যে লড়াই করে এই মর্যাদা পেয়েছি, তা ভুলো না।”
ক্রীতদাস শ্রম থেকে রাজনৈতিক চেতনা
আজকের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম অবশ্য এক দিনে হয়নি।১৯৫০ ও ৬০-এর দশক পর্যন্ত এই অঞ্চলের বহু দলিত ও দরিদ্র কৃষিশ্রমিক কার্যত জমিদারদের জমিতে আধা-ক্রীতদাসের মতো কাজ করতেন। জাতপাতের নিপীড়ন ছিল প্রবল। ন্যায্য মজুরি, জমির অধিকার, সামাজিক মর্যাদা— সবই ছিল দূরের স্বপ্ন।সেই সময় গ্রামের এক যুবক ভেম্বুলু কাজের খোঁজে তাঞ্জাভুরে যান। সেখানে প্রথম তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। কয়েক বছর পরে গ্রামে ফিরে বন্ধুদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। কৃষকসভা, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক সভা— ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে গ্রামের সামাজিক পরিবেশ।
গ্রামের প্রবীণদের কথায়, “প্রথমবার আমরা বুঝেছিলাম যে গরিব মানুষেরও অধিকার আছে।”এই রাজনৈতিক জাগরণের পিছনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল— ১৯৬৮ সালের কিলভেনমণি হত্যাকাণ্ড।তাঞ্জাভুর জেলার কিলভেনমণি গ্রামে জমিদারদের বাহিনীর হাতে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ৪৪ জন দলিত কৃষিশ্রমিককে। তাঁদের অপরাধ ছিল— তাঁরা ন্যায্য মজুরি দাবি করেছিলেন।সেই আগুন শুধু কয়েকটি কুঁড়েঘর পোড়ায়নি। তা দক্ষিণ তামিলনাড়ুর গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছিল শ্রেণি সংগ্রামের নতুন ভাষা।তার অভিঘাত পৌঁছেছিল Vannivelampatti-তেও।
“আমরা হয়তো তাঁদের মতো নই, কিন্তু…”
গ্রামের সকালের দৃশ্য যেন এক রাজনৈতিক উপন্যাসের পাতা।কার্ল মার্ক্স, জ্যোতি বসু, ফিদেল কাস্ত্রো, লেনিন— সকলে চায়ের দোকানে বসে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছেন। তাঁরা অবশ্য বিশ্বনেতা নন; তাঁরা কৃষিশ্রমিক, অটোচালক, ছোট ব্যবসায়ী।২৮ বছরের সফদর হাশমি, যিনি জিম প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন, বলছিলেন— “আমরা হয়তো মূল নেতাদের মতো নই, কিন্তু তাঁদের নাম ধারণ করতে গর্ব বোধ করি। কারণ তাঁরা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস দেন।”পোঙ্গলের সময় গ্রামের শিশুদের উপহার দেওয়া হয় চে গেভারার ছবি আঁকা টি-শার্ট। ছোট ছোট বাচ্চাদের নাম— নৃপেন চক্রবর্তী, জানকী আম্মাল, গৌরী আম্মা। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ভেনমণি জানায়, স্কুলে রোল কলের সময় অনেকেই তার নাম শুনে অবাক হয়। কিন্তু বাড়িতে তাকে বলা হয়েছে, তার নামের পিছনে ইতিহাস আছে।
গ্রামের সকালের দৃশ্য যেন এক রাজনৈতিক উপন্যাসের পাতা।কার্ল মার্ক্স, জ্যোতি বসু, ফিদেল কাস্ত্রো, লেনিন— সকলে চায়ের দোকানে বসে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছেন। তাঁরা অবশ্য বিশ্বনেতা নন; তাঁরা কৃষিশ্রমিক, অটোচালক, ছোট ব্যবসায়ী। ২৮ বছরের সফদর হাশমি, যিনি জিম প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন, বলছিলেন— “আমরা হয়তো মূল নেতাদের মতো নই, কিন্তু তাঁদের নাম ধারণ করতে গর্ব বোধ করি। কারণ তাঁরা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস দেন।” পোঙ্গলের সময় গ্রামের শিশুদের উপহার দেওয়া হয় চে গেভারার ছবি আঁকা টি-শার্ট। ছোট ছোট বাচ্চাদের নাম— নৃপেন চক্রবর্তী, জানকী আম্মাল, গৌরী আম্মা। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ভেনমণি জানায়, স্কুলে রোল কলের সময় অনেকেই তার নাম শুনে অবাক হয়। কিন্তু বাড়িতে তাকে বলা হয়েছে, তার নামের পিছনে ইতিহাস আছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এত প্রবল রাজনৈতিক পরিচয়ের পরেও গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন ধর্মহীন নয়। কালীআম্মান ও মারিয়াম্মান দেবীর উৎসব এখানে সমান উৎসাহে পালিত হয়। অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের লোকবিশ্বাস ও বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনা এখানে সংঘাতে নয়, সহাবস্থানে রয়েছে। এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কারণ ভারতীয় সমাজে বাম রাজনীতিকে প্রায়ই “শুধু শহুরে” বা “ধর্মবিরোধী” হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু Vannivelampatti দেখায়, গ্রামীণ বাস্তবতায় রাজনৈতিক চেতনা অনেক বেশি জটিল। এখানে শ্রেণি রাজনীতি ও লোকসংস্কৃতি পাশাপাশি হাঁটে।
ভোট, টাকা ও জাতপাতের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক ছোট্ট প্রতিরোধ
৩,০০০ ভোটার অধ্যুষিত এই গ্রামে লালই সবচেয়ে দৃশ্যমান রং।গ্রামবাসীরা দাবি করেন, তাঁরা ধর্ম ও জাতপাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। নির্বাচন এলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রচারে এলেও গ্রামের মানুষ সহজে প্রভাবিত হন না।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়— এখানে দেওয়ালে নেতাদের বিশাল পোস্টার খুব কম দেখা যায়। বরং দেখা যায় “সত্যকে ভোট দিন” ধরনের লেখা।গ্রামের এক বাসিন্দা লেনিন বলছিলেন,“প্রার্থীরা জানেন, এখানে টাকা বিলিয়ে ভোট কেনা সহজ নয়।”তবে এর অর্থ এই নয় যে গ্রামের সব সমস্যা মিটে গেছে।আজও বহু এলাকায় পাকা রাস্তা নেই। সরকারি শৌচাগারের মান খারাপ। উন্নয়নের ঘাটতি স্পষ্ট। কিন্তু গ্রামবাসীদের একাংশ মনে করেন, “দুর্নীতির কাছে মাথা নত না করাটাই বড় কথা।”
‘নমক্কু নামে’: আত্মনির্ভরতার দর্শন
Vannivelampatti-র আর একটি বিশেষ দিক হল আত্মনির্ভরতা।এই গ্রামে বহু উন্নয়নের কাজ হয়েছে “নমক্কু নামে” দর্শনে— অর্থাৎ “আমাদের জন্য আমরা নিজেরাই”।রাস্তা মেরামত, জলাধার সংস্কার, ছোট সেতু নির্মাণ— বহু ক্ষেত্রেই গ্রামের মানুষ সরকারি সাহায্যের অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছেন।১৯৫০-এর দশকেই গ্রামের শিক্ষক কৈলাসাম পিল্লাই ও এস. ভি. সুব্বাইয়া কৃষকদের কাছ থেকে চাল ও ডাল সংগ্রহ করে শিশুদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্প শুরু করেছিলেন। পরে তামিলনাড়ুর মিড-ডে মিল প্রকল্প দেশজুড়ে প্রশংসা পায়। কিন্তু গ্রামের মানুষ আজও মনে করেন, তাঁদের গ্রাম সেই ভাবনার অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিল।
বার্লিন প্রাচীর ভেঙেছে, কিন্তু…
অনেকে বলেন, বার্লিন প্রাচীর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিজমও শেষ হয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে ইতিহাসের “সমাপ্তি” নিয়েও তত্ত্ব লেখা হয়েছিল।কিন্তু Vannivelampatti যেন সেই দাবিকে নীরবে প্রশ্ন করে।কারণ এখানে সাম্যবাদ রাষ্ট্রশক্তি নয়, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। এটি ভোটের প্রতীক নয়; এটি আত্মমর্যাদার ভাষা।যখন গ্রামের মা তাঁর দুই কন্যার নাম রাখেন “লেনিনা” ও “মার্ক্সিয়া”, তখন বোঝা যায়— আদর্শ এখানে এখনও আবেগের নয়, পরিচয়ের অংশ।আজকের ভারতে, যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বা নির্বাচনী প্রচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে Vannivelampatti যেন অন্য এক সময়ের স্মৃতি বহন করে।এখানে এখনও একই মাঠে ফিদেল আর লেনিন ফুটবল খেলে।চে আর মার্ক্স একসঙ্গে চাষ করে।আর ইতিহাস নীরবে মনে করিয়ে দেয়— কখনও কখনও আদর্শ সত্যিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।



