হোম বাংলার ফিড পাবলিক স্ফিয়ার অফ দ্য লেন্স গ্রাউন্ড নোট রুরাল নোটবুক ক্যাম্পাস ভাইবস্ লিগ্যাল বিট অন্যান্য

চে ও চুরুট

Published on: June 17, 2026
---Advertisement---

ধোঁয়ার আড়ালে বিপ্লব: চে ও চুরুটের গল্প

হাভানার গরম দুপুরে, কিংবা বলিভিয়ার জঙ্গলে ক্লান্ত গেরিলা শিবিরে—একটি মুখ বারবার ভেসে ওঠে। এলোমেলো চুল, তীক্ষ্ণ চোখ, অলিভ-সবুজ পোশাক আর ঠোঁটের কোণে ধরা একটি চুরুট। সেই মুখের নাম Che Guevara।চে-র বিপ্লবী চরিত্র নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর চুরুট নিয়ে? আশ্চর্যভাবে, সেটিও এক রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠেছিল। আজকের সোশ্যাল মিডিয়া প্রজন্ম যেখানে প্রতিটি ছবি, প্রতিটি ‘অ্যাস্থেটিক’কে আলাদা পরিচয়ে পরিণত করে, সেখানে চে-র হাতে ধরা চুরুট যেন হয়ে ওঠে বিদ্রোহের এক ভিজ্যুয়াল লোগো।

চে নিজে ছিলেন হাঁপানির রোগী। ডাক্তাররা ধূমপান বারণ করেছিলেন বহুবার। কিন্তু কিউবার পাহাড়ি গেরিলা যুদ্ধের সময় সঙ্গীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া চুরুট ধীরে ধীরে তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, কিউবার বিখ্যাত সিগার তখন শুধু তামাক ছিল না; সেটি ছিল বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার আত্মপরিচয়ের অংশ। আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঘোষণা।

অদ্ভুত ব্যাপার হল,চে-র ছবি যত ছড়িয়েছে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের থেকে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে তাঁর ‘স্টাইল’।আজকের যুবসমাজের বড় অংশ হয়তো মার্ক্সবাদ বা লাতিন আমেরিকার গেরিলা রাজনীতি নিয়ে
বিশদ জানে না, কিন্তু চে-র মুখ চিনে যায় মুহূর্তে। কারণ বাজার খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিল—বিদ্রোহও বিক্রি হয়।

হাঁপানির রোগী, তবু চুরুটের নেশা

মজার বিষয় হল, চে ছোটবেলা থেকেই গুরুতর হাঁপানির রোগী ছিলেন। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ডাক্তারকে বহুবার চিকিৎসকেরা ধূমপান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের বিদ্রূপ সম্ভবত এমনই—যে মানুষ শ্বাসকষ্টে ভুগতেন সেই মানুষটির সাথে কিউবার গেরিলা যুদ্ধের দিনগুলোতে চুরুট ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। আর তিনিই পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে চুরুট-ধরা বিপ্লবীর প্রতীক হয়ে ওঠেন।

গেরিলা বিপ্লব ও চে গুয়েভারা সম্পর্কিত অনেক গবেষকের মতে, মেক্সিকোতে Fidel Castro-র সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই চে নিয়মিত কিউবান সিগার খেতে শুরু করেন। কিউবার সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ে গেরিলা যুদ্ধের সময় রাত জেগে পরিকল্পনা, পাহারা কিংবা দীর্ঘ ক্লান্ত অভিযানের ফাঁকে চুরুট ছিল যেন সঙ্গীদের এক অদ্ভুত বন্ধন।

চে-র সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, পাহাড়ি অভিযানের ফাঁকে, রাত জেগে পাহারা দেওয়ার সময় কিংবা যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যবর্তী ক্লান্ত মুহূর্তে তিনি প্রায়শই সিগার ধরাতেন। অনেক সময় আধখাওয়া চুরুটও নষ্ট করতেন না। পকেটে রেখে পরে আবার ধরাতেন। চে-র জীবনীকার Jon Lee Anderson তাঁর বিখ্যাত বই Che Guevara: A Revolutionary Life-এ লিখেছিলেন, চে-র কাছে সিগার ছিল “both a habit and a ritual of comradeship.” অর্থাৎ, এটি শুধু নেশা ছিল না; বরং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সংযোগও তৈরি করত।

কোন ব্র্যান্ডের চুরুট খেতেন চে?

চে সাধারণত কিউবার হাতে বানানো সিগারই পছন্দ করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর প্রিয় ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে ছিল Montecristo এবং Partagás। তবে তিনি বিলাসবহুল বা অভিজাত সিগারের চেয়ে বেশি পছন্দ করতেন সাধারণ শ্রমিকদের তৈরি শক্ত তামাকের সিগার।

একটি জনপ্রিয় কাহিনি আছে—চে নাকি খুব মোটা বা অতিরিক্ত দামি সিগার পছন্দ করতেন না। কারণ তিনি মনে করতেন বিপ্লবীর জীবন কখনও অভিজাত হতে পারে না। তাঁর কাছে চুরুট ছিল না আভিজাত্যের প্রতীক; বরং যুদ্ধক্ষেত্রের ক্লান্তির সঙ্গী।কিউবান লেখক Paco Ignacio Taibo II তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, চে-র কাছে সিগার ছিল “a companion of fatigue rather than luxury.” অর্থাৎ, ক্লান্তির সঙ্গী, বিলাসিতার বস্তু নয়।

তবে কিউবান বিপ্লবের পর বিশ্বের বাজারে কিউবার সিগারের জনপ্রিয়তা যে বহুগুণ বেড়ে যায়, তার পিছনে চে ও ফিদেলের ‘ইমেজ পলিটিক্স’-এর বড় ভূমিকা ছিল। একটা সময় আমেরিকান সংবাদপত্রগুলো পর্যন্ত লিখত—“The revolution smells of tobacco and gunpowder.”

চুরুট ও কিউবার রাজনৈতিক সংস্কৃতি

কিউবায় সিগার শুধু ধূমপানের উপকরণ নয়; সেটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ। বিপ্লব-পরবর্তী কিউবায় সিগার যেন হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীকও। আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধের মাঝেও কিউবান সিগার আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব মর্যাদা ধরে রেখেছিল।

সাংবাদিক ও লেখক Christopher Hitchens একবার লিখেছিলেন, “The Cuban cigar became an extension of revolutionary masculinity.” অর্থাৎ, কিউবান সিগার বিপ্লবী পৌরুষের এক সম্প্রসারিত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। চে ও Fidel Castro-র হাতে ধরা চুরুট সেই রাজনৈতিক ইমেজকে আরও শক্তিশালী করে। ধীরে ধীরে সেটি বিশ্বমিডিয়ায় বিপ্লবের এক ‘ভিজ্যুয়াল শর্টহ্যান্ড’-এ পরিণত হয়।

বলিভিয়ার জঙ্গলে শেষ ধোঁয়া


১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার জঙ্গলে যখন চে বন্দি হন, তখনও তাঁর ব্যাগে কিছু তামাক ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বন্দি অবস্থাতেও তিনি শান্ত ছিলেন। মাঝে মাঝে ধূমপানের অনুমতি চাইতেন।চে-র মৃত্যুর পর তাঁর ডায়েরি, পাইপ, হাতঘড়ির মতোই চুরুটও এক রাজনৈতিক স্মৃতিচিহ্নে পরিণত হয়। কিউবায় আজও বহু পর্যটকের কাছে “Che’s cigar” এক ধরনের সাংস্কৃতিক মিথ।

সময়ের আকাশে ভেসে থাকা চে এর চুরুটের ধোঁয়া

এক সময় যে মানুষ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন, তাঁর মুখই পরে জায়গা করে নেয় কোটি টাকার ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে। টি-শার্ট, মগ, পোস্টার, ক্যাফের দেওয়াল—সবখানেই চে। আর প্রায় প্রতিটি ছবিতে সেই চুরুট যেন আলাদা করে ‘কুল’ হয়ে ওঠে। বিদ্রোহ এখানে ধোঁয়ার মতোই—আছে, আবার ধরাও যায় না।তবে চে-র চুরুটকে শুধু স্টাইল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সেটির মধ্যে ছিল ক্লান্ত যোদ্ধার বিরতি, দীর্ঘ মিছিলের পরের নিঃশ্বাস, আর যুদ্ধের মাঝেও মানুষ হয়ে থাকার চেষ্টা। বিপ্লবীরা ইতিহাসের বইয়ে যতটা কঠিন, বাস্তবে তারা ততটাই রক্ত-মাংসের মানুষ। চে-র চুরুট সেই মানবিক দিকটাকেও সামনে আনে।

আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে প্রতিবাদ অনেক সময় হ্যাশট্যাগে আটকে যায়, সেখানে চে-র ছবি এখনও নতুন প্রজন্মকে এক ধরনের কৌতূহল জাগায়। কে ছিলেন এই মানুষটা? কেন তাঁর মুখ এখনও দেয়ালে আঁকা হয়? কেন একটি পুরনো সাদা-কালো ছবিও এত ‘আইকনিক’? হয়তো উত্তরটা লুকিয়ে আছে সেই ধোঁয়ার মধ্যেই।
কারণ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়না । তাঁরা ধীরে ধীরে প্রতীকে পরিণত হন। আর কিছু প্রতীক—চে-র চুরুটের ধোঁয়ার মতো—সময়ের আকাশে ভেসে থাকে বহুদিন।