হাভানার সমুদ্রের গায়ে তখনও ধোঁয়ার গন্ধ। বাতাসে লেগে আছে বারুদের ঝাঁঝ। বন্দরের জলে ভাসছে পোড়া কাঠ, ছিঁড়ে যাওয়া দড়ি, ভাঙা লোহার টুকরো। কোথাও কোনও শিশুর জুতো, কোথাও রক্তমাখা জামা। সদ্য বিপ্লব-পরবর্তী কিউবা তখনও নিজের নতুন রাষ্ট্রের শরীর গড়ে তুলছে—ঠিক সেই সময়েই এক বিস্ফোরণ যেন গোটা দ্বীপটার বুক কাঁপিয়ে দিল।
১৯৬০ সালের মার্চ। হাভানা বন্দরে বিস্ফোরণে উড়ে গেছে Le Coubre নামের একটি বেলজিয়ান মালবাহী জাহাজ। মৃত বহু মানুষ। শহরজুড়ে আতঙ্ক, ক্ষোভ, শোক। আর তার ঠিক পরদিন, হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে, রেভোলুশন স্কোয়ারের এক কোণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক মানুষ—মাথায় কালো বেরে, তাতে একটি সাদা তারা, চোখে এমন এক দৃষ্টি যেন তিনি উপস্থিত জনতাকে নয়, ভবিষ্যৎ ইতিহাসকেই দেখছেন।সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আলবের্তো কোর্দা নামের এক ফটোগ্রাফার ক্যামেরার শাটার টিপেছিলেন মাত্র দু’বার।তারপরের ইতিহাস পৃথিবী জানে।
আজ সেই ছবিটি পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীক। হয়তো বিশ শতকের সবচেয়ে বহুল পুনর্মুদ্রিত আলোকচিত্রও। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে বিপ্লবী মিছিল, ক্যাফের দেওয়াল থেকে কর্পোরেট ফ্যাশন ব্র্যান্ড—চে গুয়েভারার সেই মুখ সর্বত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ছবির জন্ম কোনও প্রচার কৌশলের অংশ হিসেবে নয়; বরং তা জন্ম নিয়েছিল শোক, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইতিহাসের এক অস্থির সন্ধিক্ষণে।
১৯৬০ সালের ৪ মার্চ, হাভানা বন্দরে নোঙর করা বেলজিয়ামের মালবাহী জাহাজ Le Coubre-এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। জাহাজটিতে ছিল প্রায় ৭৬ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ, যা ফ্রান্স থেকে কিনেছিল কিউবার নবগঠিত বিপ্লবী সরকার। সদ্য ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বাতিস্তার শাসন উৎখাত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রকাশ্যেই কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে এই বিস্ফোরণকে কিউবার নেতৃত্ব নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখেনি; বরং তারা একে সাম্রাজ্যবাদী নাশকতার অংশ বলেই মনে করেছিল।
প্রথম বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকারীরা যখন বন্দরে পৌঁছন, ঠিক তখনই ঘটে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। সরকারি হিসেব অনুযায়ী অন্তত ৭৫ থেকে ১০০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন প্রায় দু’শোরও বেশি মানুষ। এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে কিউবার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে “অবরোধ” ও “প্রতিরোধ”-এর ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
পরদিন নিহতদের স্মরণে আয়োজিত হয় গণ-অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। সেই অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, জঁ-পল সার্ত্র, সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং কিউবার বিপ্লবী নেতৃত্বের অন্যতম মুখ আর্নেস্তো ‘চে’ গুয়েভারা। সেখানেই ফিদেল প্রথম উচ্চারণ করেন ঐতিহাসিক স্লোগান—“Patria o Muerte” — অর্থাৎ “স্বদেশ অথবা মৃত্যু”।
অনুষ্ঠানের ছবি তুলছিলেন কিউবার দৈনিক Revolución-এর ফটোগ্রাফার আলবের্তো “কোর্দা” দিয়াজ। আসল নাম আলবের্তো দিয়াজ গুতিয়েরেস। বিপ্লবের আগে তিনি মূলত ফ্যাশন ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু কিউবান বিপ্লবের পর তাঁর ক্যামেরা ঘুরে যায় রাস্তায়, শ্রমিকের মুখে, কৃষকের ভিড়ে, গেরিলাদের দিকে।
কোর্দা পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “চে হঠাৎ মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর মুখে এমন এক তীব্রতা ছিল, যা আমি কোনও মানুষের মধ্যে আগে দেখিনি।”
তিনি দ্রুত Leica M2 ক্যামেরায় পরপর দুটি ফ্রেম তোলেন। প্রথমটিতে চে-র মুখ আংশিক ঢাকা ছিল। দ্বিতীয় ফ্রেমটিই পরবর্তীকালে ইতিহাস হয়ে ওঠে। ছবিটির আসল নাম ছিল Guerrillero Heroico—‘বীর গেরিলা’।
আশ্চর্যের বিষয়, ছবিটি তৎকালীন কিউবান সংবাদমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। Revolución পত্রিকায় সীমিত আকারে ছাপা হলেও, তাৎক্ষণিকভাবে এটি কোনও রাজনৈতিক পোস্টারে ব্যবহার করা হয়নি। কয়েক বছর ছবিটি কার্যত কোর্দার স্টুডিওতেই পড়ে ছিল। চে-র মৃত্যুর পর বদলে যায় পরিস্থিতি।
১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় মার্কিন CIA-সমর্থিত অভিযানে বন্দি হন চে গুয়েভারা। ৯ অক্টোবর তাঁকে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর পরে তাঁর দেহের ছবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অনেকেই সেই ছবির সঙ্গে খ্রিস্টের ‘পিয়েতা’-র ভিজ্যুয়াল মিল খুঁজে পান। কিন্তু একই সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে কোর্দার তোলা সেই জীবন্ত মুখ—যেখানে মৃত্যু নয়, বরং প্রতিরোধের দৃঢ়তা ছিল প্রধান।
ইতালীয় প্রকাশক জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লি কিউবা থেকে ছবিটির নেগেটিভ সংগ্রহ করেন এবং ইউরোপে পোস্টার আকারে ছাপাতে শুরু করেন। সেখান থেকেই ছবিটির আন্তর্জাতিক যাত্রা। ১৯৬৮ সালের প্যারিস ছাত্র আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, লাতিন আমেরিকার গেরিলা সংগ্রাম—সবখানেই চে-র মুখ হয়ে ওঠে বিদ্রোহের সার্বজনীন প্রতীক।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস সম্ভবত এখানেই।
যে মানুষ পুঁজিবাদী শোষণ, কর্পোরেট সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলেছিলেন, তাঁর মুখই পরবর্তীকালে বিশ্ববাজারের অন্যতম সফল “ব্র্যান্ড ইমেজ”-এ পরিণত হয়। টি-শার্ট, পোস্টার, কফি মগ, লাইটার, ব্যাগ—সব জায়গায় ছাপা হতে থাকে সেই মুখ। এমনকি ১৯৯০-এর দশকে স্মিরনফ ভদকার বিজ্ঞাপনেও ব্যবহার করা হয় চে-র ছবি।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কোর্দা। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “চে কখনও মদ্যপানকে উৎসাহ দিতেন না। তাঁর ছবিকে এইভাবে ব্যবহার করা তাঁর স্মৃতির অপমান।” পরে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেন এবং ক্ষতিপূরণের টাকা কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দান করেন।
আজও চে-র ছবিকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অনেকের মতে, এটি এখনও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিকদের একাংশ মনে করেন, পুঁজিবাদ এতটাই শক্তিশালী যে সে নিজের বিরোধীকেও শেষ পর্যন্ত পণ্যে পরিণত করে ফেলে। সম্ভবত এই দ্বন্দ্বই চে-র ছবিটিকে এখনও জীবন্ত রাখে।
এই কারণেই ছয় দশক পরেও চে গুয়েভারার সেই ছবিটি শুধু একটি আলোকচিত্র হয়ে থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু ছবি ফিকে হয়ে যায়, বহু স্লোগান ইতিহাসের পাতায় আটকে পড়ে। অথচ কোর্দার ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই মুখ এখনও অদ্ভুত ভাবে জীবন্ত। কারণ সেই চোখের ভিতরে কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত দৃঢ়তা নেই—আছে একটি সময়ের ক্ষত, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, আর অসমাপ্ত ভবিষ্যতের প্রতি এক অনমনীয় বিশ্বাস।
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—এটি একই সঙ্গে স্মৃতি এবং প্রশ্ন। একদিকে এটি বিপ্লবের রোম্যান্টিক প্রতীক, অন্যদিকে পুঁজিবাদী বাজারের সবচেয়ে সফল ভিজ্যুয়াল পণ্যগুলির একটি। দেওয়ালে ঝোলানো পোস্টার থেকে বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড—চে-র মুখ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই বিশ্বজয়ের মধ্যেও ছবিটির চোখে আজও এক ধরনের অস্বস্তি রয়ে গেছে। যেন সেই দৃষ্টি এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে—স্বপ্নগুলো সত্যিই শেষ হয়ে গেছে? নাকি আমরা শুধু সেগুলোকে টি-শার্টে ছাপিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েছি?
হাভানার বন্দরে বিস্ফোরণের সেই বিকেলে আলবের্তো কোর্দা হয়তো কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্য শাটার টিপেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও এমনই—একটি মুহূর্তকে তুলে এনে তা পুরো শতাব্দীর প্রতীকে পরিণত করে।
আর সেই কারণেই, এত বছর পরেও, পৃথিবীর ভিড়ে, বিজ্ঞাপনের আলোয়, রাজনৈতিক মিছিলে কিংবা কোনও এক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের দেওয়ালে—চে-র সেই মুখ আবার ফিরে আসে। যেন এখনও তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের দিকে।
